Logo
প্রিন্টের তারিখ: 13 September 2026 | প্রকাশের তারিখ: Sep 13, 2026

সংবাদ শিরোনাম : গোলাপগঞ্জ হাসপাতালে কেলেঙ্কারির অভিযোগ: অনৈতিকতা ও ধামাচাপা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন

গোলাপগঞ্জ হাসপাতালে কেলেঙ্কারির অভিযোগ: অনৈতিকতা ও ধামাচাপা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন
সেবার আলো জ্বালানোর কথা যে প্রতিষ্ঠানটির, সেখানে এখন চলছে অন্ধকারের রাজত্ব। চিকিৎসা নিতে আসা অসহায় মানুষের আর্তনাদ ছাপিয়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অন্দরে এখন তৈরি হয়েছে অনৈতিকতা, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অপরাধ ধামাচাপার এক নাটকীয় পরিস্থিতি। সরকারি এই হাসপাতালের বারান্দা থেকে রান্নাঘর—সবখানেই বহিরাগত সিন্ডিকেট ও কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার দুর্নীতির থাবায় এক অচলাবস্থা বিরাজ করছে।

সম্প্রতি গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শক কানাই লাল দেবের একটি ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর নড়েচড়ে বসেছে এলাকাবাসী। নিজ পরিবার ও সামাজিক অনুশাসনকে উপেক্ষা করে যেভাবে তিনি পরকীয়া ও অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছেন, তা নিয়ে চলছে তীব্র সমালোচনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি দায়িত্ব পালনের চেয়ে তাঁর মূল মনোযোগ ছিল ব্যক্তিগত নানা কার্যক্রমে। আর এই ঘটনা ধামাচাপা দিতে শুরু হয় ক্ষমতার অপব্যবহার।

তবে কানাই লালের এই ঘটনা ছাপিয়ে আরও বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে হাসপাতালের ভেতরের আউটসোর্সিং ও সাব-কন্ট্রাক্ট কর্মীরা। হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, রান্নাঘরে কর্মরত আবিদা এবং তার সহযোগী (টিআইসি) ডাঃ সুদর্শন সেনের পার্সোনাল কর্মচারী  ও মিজান হাসপাতালের খাবারের দায়িত্বে থাকা হবি তাদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। রোগীদের সঙ্গে অসদাচরণ তো বটেই, রাতের আঁধারে হাসপাতাল চত্বরে বহিরাগত পুরুষদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল ওপেন সিক্রেট। একাধিকবার হাতেনাতে ধরা পড়ার পরও প্রতিবারই তাদের মুখে ছিল এক অভিন্ন অজুহাত—তারা নাকি সবার ‘খালাতো ভাই’।

ঘটনার দিন রাতে এমনি এক সন্দেহজনক দৃশ্য ধরা পড়ে দায়িত্বরত আনসার সদস্যদের চোখে। পানি তোলার টিউবওয়েলের সামনে ওই নারী কর্মীর কক্ষে বহিরাগতদের প্রবেশ ও আপত্তিকর গতিবিধি দেখে ফেলেন সিকিউরিটি গার্ড ও আনসাররা। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই পরিস্থিতি পাল্টে দিতে মাঠে নামে হাসপাতালের একটি প্রভাবশালী মহল। অভিযোগ উঠেছে, টিআইসি ডা. সুদর্শন সেন, তাঁর ব্যক্তিগত কর্মচারী হিসেবে পরিচিত এবং তথাকথিত ‘দ্বিতীয় টিআইসি’খ্যাত মিজান এবং হাসপাতালের খাবারের ঠিকাদার হবিগঞ্জ বা পার্শ্ববর্তী এলাকার শেখরুল ইসলামের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে আনসার সদস্যদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সত্য গোপনের এই চেষ্টা এখানেই শেষ হয়নি। পার্শ্ববর্তী থানা এলাকা থেকে আসা ওই বহিরাগত ব্যক্তিকে নারীকর্মী আবিদার ‘খালাতো ভাই’ হিসেবে চালিয়ে দিয়ে হাসপাতাল চত্বরেই এক রুদ্ধদ্বার নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। আনসার সদস্যরা এই অনৈতিকতার প্রতিবাদ জানালে তাদের মুখ বন্ধ রাখতে হুমকি দেওয়া হয়। এমনকি পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যাওয়া এক সংবাদকর্মীর সঙ্গেও চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন ওই নারী কর্মী আবিদা।

দায়িত্বরত আনসার সদস্য নিপেন্দ্র ও আনোয়ার এই ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, তাদের ওপর এমন নজিরবিহীন চাপ প্রয়োগ করা হয়েছে। ১০ সদস্যের আনসার টিমের কমান্ডারের স্পষ্ট বক্তব্য, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নিরাপত্তাকর্মী ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এ ধরনের হস্তক্ষেপ হাসপাতালের নিরাপত্তাকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এদিকে হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিআইসি) ডা. সুদর্শন সেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁর বক্তব্যে জনমনে ক্ষোভ আরও বেড়েছে। তিনি দাবি করেছেন, অভিযুক্ত কর্মীরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ে নিয়োজিত থাকায় তাদের দায় সরাসরি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নয়। তবে প্রশ্ন উঠেছে, একটি সরকারি স্পর্শকাতর প্রতিষ্ঠানে এমন অনাচার চললে তার দায় কার? ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের এমন বেপরোয়া আচরণ এবং খোদ দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের এমন ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা জনমনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

খাবারের নিম্নমান, নানা অনিয়ম আর অনৈতিকতার চাদরে ঢাকা গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এখন সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। সচেতন মহলের জোর দাবি, অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে এই অসাধু সিন্ডিকেটকে আইনের আওতায় আনা হোক। অন্যথায় সেবার এই প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত হতে সময় লাগবে না।
দৈনিক সিলেট টাইমস 24
Developed by ZapStudio Network
🖨️ প্রিন্ট 💾 JPG 📄 PDF