গোলাপগঞ্জের সাংবাদিকতা অঙ্গনে পুরোনো বিরোধ যেন নতুন করে সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি পোস্ট, ব্যক্তিগত সমালোচনা, সাংবাদিক পরিচয় নিয়ে বিতর্ক এবং একাধিক পুরোনো অপ্রীতিকর ঘটনার প্রসঙ্গ ঘিরে চলছে আলোচনা।
সম্প্রতি সাংবাদিক খালেদ আহমদ, সাংবাদিক কামাল খান, সাংবাদিক হারিছ আলী এবং গোলাপগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের প্রধান উপদেষ্টা ও ব্যবসায়ী কামরান উদ্দিন বাদলকে নিয়ে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি থেকে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব পোস্টের পেছনে কারা রয়েছেন এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা কতটুকু, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তবে এ ধরনের পাল্টাপাল্টি প্রচারণার মধ্যে আলোচনায় আসছে গোলাপগঞ্জের সাংবাদিকতা অঙ্গনের অতীতের বেশ কিছু ঘটনাও।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গোলাপগঞ্জে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক পরিচয়ধারী কয়েকজন ব্যক্তিকে ঘিরে উত্তেজনা, হামলা কিংবা জনরোষের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর মধ্যে তৎকালীন গোলাপগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান চৌধুরীকে ঘিরে একটি হামলার ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে ধারাবাহিক পোস্ট ও সমালোচনার জেরে একপর্যায়ে তিনি হামলার শিকার হন।
ঘটনার প্রকৃত কারণ, হামলাকারীদের পরিচয় এবং এর পেছনে কোনো পূর্ববিরোধ ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কর্মকাণ্ড কখনোই তার ওপর হামলা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বৈধতা তৈরি করে না।
আরেকটি আলোচিত ঘটনা সাংবাদিক আব্দুল আহাদ নুর মিয়াকে ঘিরে। কয়েক বছর আগে গোলাপগঞ্জে তাকে নিয়ে একটি অপ্রীতিকর ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
ভিডিওতে তাকে হয়রানি ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার দৃশ্য থাকার দাবি করা হলেও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং আইনগত অবস্থান যাচাই করা জরুরি।
একজন সাংবাদিকের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটলে সেটি যেমন নিন্দনীয়, তেমনি ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তারও আইনানুগ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
সম্প্রতি গোলাপগঞ্জের ধারাবহর এলাকায় একটি আবাসন প্রকল্পে টিলা কাটার অভিযোগ নিয়ে ভিডিও ধারণ ও অর্থ দাবির অভিযোগকে কেন্দ্র করে আরেকটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে।
এক পক্ষের দাবি, প্রকল্পের টিলা কাটার বিষয়টি ভিডিও ধারণ করে অর্থ দাবি করা হয়েছিল। অপর পক্ষের অভিযোগ, ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন গণমাধ্যমকর্মীকে মারধর করা হয় এবং তার ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
এখানে মূল প্রশ্ন দুটি। সত্যিই যদি অবৈধভাবে অর্থ দাবি করা হয়ে থাকে, তার তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা কোথায়? আবার অর্থ দাবির অভিযোগের কারণে যদি কাউকে শারীরিকভাবে হামলা করা হয়ে থাকে, তার বিচারই বা কোথায়?
দুই ক্ষেত্রেই আইনগত তদন্ত ছাড়া কোনো পক্ষকে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা সমীচীন নয়।
গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এলাকায় সাংবাদিক পরিচয়ধারী এক ব্যক্তিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে একটি অপ্রীতিকর ঘটনার কথাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের কথাও বলা হচ্ছে।
তবে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ প্রমাণ, পুলিশি নথি, মামলা বা জিডি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছাড়া তা সত্য হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়।
একইভাবে কারও বিরুদ্ধে চাঁদা দাবি কিংবা বিজ্ঞাপনের নামে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ থাকলে সেটিও নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
গোলাপগঞ্জের সাংবাদিকতা অঙ্গনের বিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে সাংবাদিক সংগঠনের পরিচয় ও দায়িত্বশীলতা।
কোনো প্রেসক্লাবের সদস্য বা পদধারী হওয়া মানে সামাজিকভাবে বাড়তি দায়িত্ব বহন করা। সেই পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যদি অন্যায় সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন, সেটি যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করার পথও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত নিজেদের সদস্যদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষভাবে বিষয়গুলো দেখা এবং প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
বর্তমান বিরোধের আরেকটি দিক হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। নাম-বেনামে কিংবা ভুয়া পরিচয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিকে নিয়ে পোস্ট দেওয়ার অভিযোগ নতুন নয়।
এ ধরনের পোস্টের মাধ্যমে কারও বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হলে তার প্রমাণ কী, অভিযোগের উৎস কোথায় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা জরুরি।
কারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি অসত্য অভিযোগও মুহূর্তে হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে।
গোলাপগঞ্জের সাংবাদিকতা অঙ্গনকে ঘিরে পুরোনো ও নতুন সব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকে।
তাদের মতে, সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অন্যায় করলে তার বিচার হওয়া উচিত। আবার সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হয়রানি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ থাকলেও তার তদন্ত হওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মাদক, চাঁদাবাজি, প্রতারণা কিংবা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠলে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টের ভিত্তিতে নয়, বরং আইনগত নথি, প্রত্যক্ষ প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতাকে ঘিরে।
সাংবাদিকতা যদি মানুষের কথা বলার মাধ্যম হয়, তাহলে সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে কাউকে হয়রানি, ভয় দেখানো কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের অভিযোগেরও কোনো জায়গা থাকা উচিত নয়।
অতীতের ঘটনাগুলো যদি সত্যিই ঘটে থাকে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। অভিযোগ সত্য হলে ব্যবস্থা নেওয়া হোক, আর মিথ্যা হলে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারও সম্মান রক্ষা করা হোক।
কারণ ‘যেমন কর্ম তেমন ফল’ কথাটি প্রতিশোধের আহ্বান নয়; বরং প্রত্যেক কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি সামাজিক শিক্ষা।