Logo
প্রিন্টের তারিখ: 18 October 2026 | প্রকাশের তারিখ: Oct 18, 2026

সংবাদ শিরোনাম : গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার সংকট, অনিয়মের অভিযোগ—তদন্তের দাবি

গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবার সংকট, অনিয়মের অভিযোগ—তদন্তের দাবি

৫০ শয্যার হাসপাতাল, তবু কাঙ্ক্ষিত সেবা কোথায়?

গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জনবল ও চিকিৎসাসেবা সংকট, অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকার অভিযোগ; ওষুধ, যন্ত্রপাতি, খাবার ও কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

গোলাপগঞ্জ (সিলেট) প্রতিনিধি

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষের সরকারি চিকিৎসার অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল। ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও হাসপাতালটির কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। জনবল সংকট, অস্ত্রোপচার কার্যক্রম, বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার, সরকারি ওষুধের প্রাপ্যতা, পরিচ্ছন্নতা এবং ভর্তি রোগীদের খাবারের মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালে চিকিৎসক থাকলেও প্রয়োজনীয় অনেক চিকিৎসা কার্যক্রম নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। বিশেষ করে অপারেশন থিয়েটার থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত অস্ত্রোপচার না হওয়ায় অনেক রোগীকে বাইরে যেতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সরকারি নথিতেও জনবল ঘাটতির চিত্র

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের Facility Registry অনুযায়ী গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের Facility ID 2173 এবং প্রতিষ্ঠান কোড 10002182। ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ সরকারি তথ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকার তথ্য রয়েছে।

সরকারি HRM তথ্য অনুযায়ী মেডিকেল অফিসার, সার্জারি, গাইনি ও অবস, নাক-কান-গলা, চক্ষু, চর্ম ও যৌন এবং কার্ডিওলজিসহ বিভিন্ন পদে শূন্যতা রয়েছে।

এ ছাড়া ৩০টি অনুমোদিত সিনিয়র স্টাফ নার্স পদের বিপরীতে ২১ জন এবং পাঁচটি অনুমোদিত ক্লিনিং স্টাফ পদের বিপরীতে মাত্র একজন কর্মরত দেখানো হয়েছে।

ফলে হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

প্রায় এক দশক আগেও উঠে এসেছিল একই ধরনের সংকট

গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সংকট নতুন নয়। ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে ‘লোকবলসংকটে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা’ শিরোনামে হাসপাতালটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়।

ওই প্রতিবেদনে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা ও জনবল ঘাটতির কথা উঠে আসে। সার্জারি বিশেষজ্ঞ ও অবেদনবিদের সংকটে অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছিল।

প্রতিবেদনটিতে তৎকালীন স্বাস্থ্য কর্মকর্তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, চাহিদার তুলনায় বছরে প্রায় ৫০–৫৫ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ পাওয়া যেত। ফলে ওষুধ সংকটের কথাও উঠে এসেছিল।

প্রায় এক দশক পরও হাসপাতালের সেবা নিয়ে নতুন করে একই ধরনের অভিযোগ ওঠায় প্রশ্ন হচ্ছে—এত বছরেও সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান কেন হয়নি?

২০২৬ সালেও চিকিৎসা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ

২১ এপ্রিল ২০২৬ প্রকাশিত যুগান্তরের এক প্রতিবেদনে গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার কথা উঠে আসে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে ECG, ল্যাব, আলট্রাসনোগ্রাম ও অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছিল।

এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—হাসপাতালে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও যন্ত্রপাতি থাকলেও সেগুলো সচল রেখে রোগীদের নিয়মিত সেবা দেওয়া যাচ্ছে কি না।

অপারেশন থিয়েটার আছে, অস্ত্রোপচার কোথায়?

স্থানীয় রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, অপারেশন থিয়েটার থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত অস্ত্রোপচার হচ্ছে না।

তবে এ বিষয়ে প্রকৃত চিত্র জানতে হাসপাতালের গত ১২ মাসের অপারেশন রেজিস্টার, সার্জারি তালিকা, অ্যানেসথেসিয়া রোস্টার এবং রোগী রেফারের তথ্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

কারণ শুধু চিকিৎসক পদে লোক থাকা যথেষ্ট নয়—সেবা বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু সচল কতটি?

হাসপাতালে বিভিন্ন চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি থাকার কথা থাকলেও রোগীদের অভিযোগ, সব যন্ত্র সবসময় ব্যবহারযোগ্য থাকে না।

কোন যন্ত্র সচল, কোনটি নষ্ট, কখন থেকে নষ্ট এবং মেরামতের জন্য কত টাকা ব্যয় হয়েছে—এসব তথ্য হাসপাতালের যন্ত্রপাতির রেজিস্টার ও রক্ষণাবেক্ষণ নথি পরীক্ষা করলে স্পষ্ট হবে।

সরকারি ওষুধের পরিবর্তে বাইরে থেকে কেনার অভিযোগ

রোগীদের একটি অংশের অভিযোগ, প্রেসক্রিপশনে লেখা অনেক ওষুধ হাসপাতাল থেকে না পেয়ে বাইরে থেকে কিনতে হয়।

সরকারি ওষুধ সরবরাহের প্রকৃত অবস্থা জানতে হাসপাতালের চাহিদাপত্র, সরবরাহ চালান, ওষুধের স্টক রেজিস্টার এবং রোগীদের ওষুধ বিতরণ রেজিস্টার পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

২০১৬ সালের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে চাহিদার তুলনায় ৫০–৫৫ শতাংশ ওষুধ সরবরাহ পাওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল। বর্তমান ২০২৬ সালের পরিস্থিতি অবশ্যই নতুন নথি দিয়ে যাচাই করতে হবে।

রোগীর খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ

ভর্তি রোগীদের খাবার নিয়েও স্থানীয় রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের দাবি, নির্ধারিত পরিমাণ ও মান অনুযায়ী খাবার সবসময় পাওয়া যায় না এবং খাবারের মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।

সরকারি হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের খাবারের জন্য বরাদ্দ রয়েছে এবং সাধারণভাবে তিন বেলার খাবার দেওয়ার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু গোলাপগঞ্জে বাস্তবে কী মেন্যু, কী পরিমাণ এবং কী মানের খাবার দেওয়া হচ্ছে—তা যাচাইয়ের জন্য হাসপাতালের বর্তমান খাদ্য সরবরাহের টেন্ডার, কার্যাদেশ, অনুমোদিত মেন্যু, রোগীসংখ্যা ও ঠিকাদারের বিল পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে রোগীরা নির্ধারিত মানের খাবার পাচ্ছেন কি না—সেটিও তদন্তের বিষয়।

পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন

হাসপাতালের পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, বিভিন্ন স্থানে অপরিচ্ছন্নতা এবং বাথরুমের দুরবস্থা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সরকারি তথ্যে পাঁচটি অনুমোদিত Cleaning Staff পদের বিপরীতে মাত্র একজন কর্মরত দেখানো হয়েছে।

এ অবস্থায় হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম নিয়মিত ও যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

‘সঞ্জয়’কে ঘিরে নানা অভিযোগ

হাসপাতালে ‘সঞ্জয়’ নামে পরিচিত একজনকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে নানা অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, তিনি আগে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। বর্তমানে তাঁর দায়িত্ব ও পদবি নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি হাসপাতালের বাইরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বসে রোগী দেখেন এবং চিকিৎসকের মতো প্রেসক্রিপশন দেন।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত বর্তমান কর্মচারী তালিকা থেকে তাঁর পূর্ণ পরিচয় ও বর্তমান পদবি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

তাই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে নিয়োগপত্র, বর্তমান পদবি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাগত নিবন্ধন, ডিউটি রোস্টার ও বায়োমেট্রিক উপস্থিতির তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

সম্পদের উৎস নিয়েও স্থানীয়দের প্রশ্ন

‘সঞ্জয়’ নামে পরিচিত ওই ব্যক্তির আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন এবং হাসপাতালের আশপাশে তাঁর নামে বা তাঁর দখলে থাকা বড় ভবন/সম্পত্তি নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের একাংশের প্রশ্ন—তাঁর বৈধ আয় ও সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং সম্পদগুলো কীভাবে অর্জিত হয়েছে?

তবে সম্পদের মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে সরকারি দলিল ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।

এ কারণে ভূমি অফিসের দলিল, খতিয়ান, ভবনের অনুমোদন, আয়কর নথি ও বৈধ আয়ের হিসাব পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।

যদি অভিযোগের সত্যতা থাকে, তাহলে সম্পদের উৎসের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে স্পষ্ট হওয়া উচিত।

এত অভিযোগের পরও কার্যকর তদন্ত নেই কেন?

গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এটিই—বছরের পর বছর জনবল, ওষুধ, অস্ত্রোপচার, যন্ত্রপাতি ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে অভিযোগ থাকার পরও সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান কেন হচ্ছে না?

শুধু তদন্ত কমিটি গঠন নয়; তদন্তের ফলাফল কী, দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে একই সমস্যা বন্ধ হয়েছে কি না—এসব তথ্যও জনগণের সামনে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের কাছে যেসব তথ্য প্রকাশের দাবি

হাসপাতালের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিম্নোক্ত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা—

১. অনুমোদিত ও কর্মরত জনবলের পূর্ণ তালিকা।
২. বর্তমানে শূন্য পদগুলোর তালিকা।
৩. গত এক বছরের অপারেশন রেজিস্টার।
৪. বর্তমানে সচল ও অচল যন্ত্রপাতির তালিকা।
৫. গত এক বছরের ওষুধ সরবরাহ ও বিতরণের হিসাব।
৬. বর্তমানে স্টকে থাকা ওষুধের তালিকা।
৭. রোগীদের খাবারের টেন্ডার, মেন্যু ও বিলের হিসাব।
৮. পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের দায়িত্ব ও কর্মীদের উপস্থিতির তথ্য।
৯. হাসপাতালের কর্মচারীদের বায়োমেট্রিক উপস্থিতির তথ্য।
১০. ‘সঞ্জয়’ নামে পরিচিত ব্যক্তির নিয়োগ, পদবি ও দায়িত্বের সরকারি তথ্য।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এসব অভিযোগকে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক পক্ষের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে না দেখে নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বের করা প্রয়োজন।

অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগের কোনো অংশ সত্য না হলে সেটিও জনগণের সামনে পরিষ্কার করা উচিত।

কারণ একটি সরকারি হাসপাতাল শুধু ভবন, শয্যা ও যন্ত্রপাতির নাম নয়। রোগী যখন সেখানে চিকিৎসার আশায় যান, তখন তিনি কার্যকর চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও মানবিক সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন।

গোলাপগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা—অভিযোগের আড়ালে নয়, নথি ও তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রকৃত চিত্র।

দৈনিক সিলেট টাইমস 24
Developed by ZapStudio Network
🖨️ প্রিন্ট 💾 JPG 📄 PDF